শায়খুল হাদীস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী দা.বা.। বাংলাদেশের উলামায়ে হাক্কানীদের মধ্য থেকে অন্যতম এক কামিল বুযুর্গ। প্রবীণ শায়খুল হাদীস। দীর্ঘ ৬০ বছর থেকে পবিত্র বুখারী শরীফের দারস দিচ্ছেন। তিনিই একমাত্র বিরল বৈশিষ্টের অধিকারী যে, শিক্ষকতার শুরু থেকেই পড়ন্ত বয়স পর্যন্ত সিহাহ সিত্তার সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল গ্রন্থ পবিত্র বুখারীর দারস দিয়ে অাসছেন।
তাঁর আগে এ উপমহাদেশে আকাবিরে উলামাদের মধ্যে থেকে শুরু থেকে এতো দীর্ঘ সময় কেউ পবিত্র বুখারীর দারস প্রদান করেন নি। দশ/ বারো বছর হাদীসের অন্যান্য কিতাবাদি পড়ানোর পর অনেকেই শায়খুল বুখারী বা শায়খুল হাদীসের মর্যাদায় আসীন হয়েছেন। পরবর্তীতে অনেক এমনও হয়েছেন যাদেরকে বিশ্ববাসী শায়খুল হাদীস হিসেবে চিনতো, জানতো। তাঁদের নামের সঙ্গে শায়খুল হাদীস বিশেষণ অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত থাকতো।
যেমন- বাংলাদেশে আমরা শায়খুল হাদীস হিসেবে স্মরণ করি আল্লামা আজীজুল হক রাহ. কে। ঠিক তদ্রূপ ভারত উপমহাদেশ তথা মুসলিম বিশ্বে শায়খুল হাদীস হিসেবে যিনি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন তিনি হলেন আল্লামা জাকারিয়া কান্ধলভী মুহাজিরে মক্কী রাহ.। তাঁরা কিন্তু তাঁদের কর্মজীবনের শুরুতেই শায়খুল হাদীস হয়ে যান নি।
কর্মজীবনের শুরুতেই যিনি শায়খুল হাদীসের মর্যাদায় আসীন হয়েছিলেন তিনি আমাদের বাংলাদেশের বর্তমান উলামায়ে কেরামের উজ্জ্বল নক্ষত্র আল্লামা মুকাদ্দাস আলী দা.বা.। আমাদের সিলেটে "মুহাদ্দিস সাব হুযুর" নামে তিনি পরিচিত।
![]() |
| শায়খুল হাদীস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী |
গুমনাম প্রচারবিমুখ ব্যক্তিত্ব। সিলেট জেলার বাইরে আলিম সমাজ ছাড়া তাঁর তেমন একটা পরিচিতি নেই। উলামায়ে কেরামের মধ্যে কিছুসংখ্যক এমনও পাওয়া যাবে যারা তাঁর নামও কোনোদিন শুনেন নি। এমন বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার পরও নিজ ভূমে তিনি অপরিচিত। লুকায়িত। নিজেকে জাহির করতে কখনো মরিয়া হয়ে উঠেন নি।
নিজের প্রচার-প্রসারের তরে লোকবল তৈরি করেন নি। একেবারে মাটির মানুষ। শায়খুল ইসলাম বাহরুল উলূম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী রাহ.এর ভাষায়- তিনি হলেন 'মাটিয়া ফিরিস্তা '। শান্ত শিষ্ট ও পরিশীলিত মনের অধিকারী। আল্লাহর রঙে রঙীন তাঁর গোটা জীবন। সুন্নাতে রাসূলের অপূর্ব সমাহার খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে তিনি নীরব সাধক। আত্মভোলা পথহারা পথিকের দরদী চিকিৎসক। পাপ পঙ্কিল জীবন থেকে পূণ্যবানের কাতারে ফিরিয়ে আনার এক মহান দায়ী। যার গোটা জীবনটাই উম্মাহর তরে নিবেদিত। গিবত-শেকায়ত, পরনিন্দা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে যিনি শতশত মাইল দূরে। আত্মগরীমা ও অহঙ্কারের লেশমাত্র চিহ্ন তাঁকে স্পর্শ করে নি কখনো। জন্মসূত্রেই আল্লাহপাক! তাঁকে কামিল ওলীর স্বভাব দিয়েই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।
ইলমী অঙ্গনে যেমন সবার সরে তায সিয়াসী তথা রাজনৈতিক অঙ্গনেও সবার মুরব্বী। তাঁর শানদার বুখারীর দারস থেকে যেভাবে হাজার হাজার মুহাদ্দিসিন উপকৃত হয়েছেন ঠিক তদ্রূপ তাঁর হেকমতপূর্ণ রাজনৈতিক তরবিয়ত থেকেও হাজার হাজার ইসলামী আন্দোলনের জানবাজ কর্মীরা উপকৃত হয়েছেন। আধ্যাত্মিকতার লাইনেও তাঁর থেকে অনেকে নিজের জীবনের পাথেয় সঞ্চয় করেছেন। মোটকথা তিনি সব ক্ষেত্রের উৎসস্থল। তাঁর পূতঃপবিত্র জীবনে কেউ সামান্যতমও কালিমা লেপন করতে পারে নি। ইনশা আল্লাহ! পারবেও না। আল্লাহর নুসরাত ও রাহমাতই তার সঙ্গী হয়ে থাকবে।
তিনি ধর্ম-বর্ণ ও জাত-পাত নির্বিশেষে সকলের পরমপ্রিয়। শ্রদ্ধারপাত্র। দুআর জায়গা। সবাই তাঁকে মহব্বত করে। সমীহ করে। এতে বিন্দুমাত্র কেউ কার্পণ্য করতে দেখি নি। যার বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখেছি গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, সোমবারে। সেদিন ছিলো তাঁর সম্মানে বিশাল সংবর্ধনা। জকিগঞ্জের টাউন ঈদগাহ ময়দানে। সমগ্র ঈদগাহ ময়দান লোকে লোকারণ্য। উপচেপড়া ভিড়। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মাসলাকে দেওবন্দের অনুসারী ছাড়াও ভিন্নমতের ভিন্নপথের হাজার হাজার শ্রোতাদের ঢল নেমেছিলো এ মাহফিলে।
আমি নিজে দেখেছি কত হিন্দু ধূতি পরে সে অনুষ্ঠানে শরীক হতে। জকিগঞ্জের একটু পশ্চিমে মুচিদের কয়েকটি পরিবার বসবাস করে। তারা সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির সেক্রেটারীর কাছে আবদার রেখেছিলো - তাদের এ দিকে যেনো একটি মাইক লাগানো হয়।
যাতে তারাও মুহাদ্দিস সাহেবের সম্মানে আয়োজিত মাহফিলে উপস্থিত অতিথিদের মুখ থেকে কিছু কথা শুনতে পারে। সর্বোপরি মুহাদ্দিস সাহেবের দুআ থেকে তারা যেনো বঞ্চিত না থাকে। এই হলো মুহাদ্দিস সাহেবের প্রতি তাদের ভালোবাসার অপূর্ব নযরানা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা উলামায়ে কিরাম তাশরীফ রেখেছিলেন। অতিথিদের উপস্থিতিতে বিশাল মঞ্চ কানায় কানায় পূর্ণ ছিলো। জকিগঞ্জের ইতিহাসে টাউন ঈদগায় এই প্রথমই এতো বড় পিণ্ডেল ও মঞ্চ নির্মাণ হয়েছে। যা কিনা এর আগে কোনদিনও হয় নি। সর্বশ্রেণীর লোকদের নির্মল নিখাঁদ সংবর্ধনায় সিক্ত হলেন হযরত।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হযরতকে দেয়া হয় রকমারি গিফট্ সামগ্রী। এমন সুন্দর ও সু-শৃঙ্খল শান্তিপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করায় " শায়খুল হাদীস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী ফাউণ্ডেশন" কে মোবারকবাদ জানাই। তাঁদেরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশ-জাতি নতুন করে শায়খুল হাদীস আল্লামা মুকাদ্দাস আলী দা.বা. কে চিনতে পারলো। জানতে পারলো তাঁর গোটা জীবনের বৃহৎ কর্ম।
আল্লাহ তাদের এ মেহনতকে কবুল করেন এবং হযরত শায়খের হায়াতকে আমাদের জন্যে দীর্ঘ করেন। আর তাঁর থেকে ফয়েয নিয়ে আমাদেরকেও আরো উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করেন। আ-মীন। ইয়া রাব্বাল আ-লামীন।


0 comments: